কিভাবে আপনার লেখা আরও বেশি আকর্ষণীয় করবেন-লেখালেখির দক্ষতা বৃদ্ধির ১৬ টি উপায়!

যারা পড়াশোনা করেছে, তাদের সবাই জীবনে কম বেশি লিখেছেন। কখনো পরীক্ষার হলে, কখনোবা বাসায় স্কুলের বাড়ীর কাজ করার জন্য অথবা, চলতি পথে ছোটখাটো লেখালেখি তো করা লাগে প্রায়ই, তাই না?

এই পোস্ট এর বিষয়বস্তু কিন্তু সে ধরণের লেখা নয়! এর বিষয়বস্তু হচ্ছে ক্রিয়েটিভ লেখার দক্ষতা বৃদ্ধি। ক্রিয়েটিভ লেখা বলতে, নিজস্ব জ্ঞানের আলোকে নতুন ধরণের এবং ঘরনার লেখালেখিকেই মূলত বুজানো হয়েছে। আপনার জ্ঞান, আপনার চর্চা, আপনার দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে আপনি যখন নতুন লেখা তৈরি করবেন নিজস্ব স্বকীয়তা দিয়ে, আপনার অর্জিত জ্ঞান যখন স্থাপিত হবে আপনার লেখায়, তখন কিন্তু জ্ঞান অর্জন এবং শেয়ার এর টেস্ট ই আলাদা!

আপনি তো লিখতে চান। হ্যাঁ আমি জানি আপনি লিখতে আগ্রহী! নতুবা, এই পোস্ট এ আপনি মোটেও চোখ বুলাতেন না! আর যদি এই পোস্ট প্রচুর আগ্রহ নিয়ে আপনি পড়তে থাকেন, তার মানে এই যে আপনার লেখালেখি শেখার ব্যাপারে প্রচুর আগ্রহ রয়েছে। আমি ধরে নিচ্ছি যে আপনি লেখালেখিতে আপনার হাত টা পাকাতে চাচ্ছেন। হাতটাকে পাকাতে চাইলে, মনখুলে যে প্রচুর লিখতে হবে, পারবেন তো?


১। প্রচুর পড়াশোনা করা
আসলে, লিখতে গেলে জানতে হয় প্রচুর। পড়তে হয় অনেক। কেননা, একজন লেখক তার জ্ঞানের পরিমণ্ডল থেকেই তার সুন্দর সুন্দর লেখাগুলি তুলে ধরেন। সে নিত্য পড়াশোনার মাধ্যমে তার জ্ঞানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে তুলে এবং যখন কোন একটি বিষয়ের উপর লিখে, তখন তার অর্জিত জ্ঞানের আলোকেই মূলত তার লেখাটা ফুটিয়ে তুলে। একারনে, একজন লেখক এর জ্ঞান ভাণ্ডার যতবেশি সমৃদ্ধ, তার লেখা ততবেশি সমৃদ্ধ এবং সুন্দর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই, আপনি যদি সত্যি সত্যিই একজন ভালো মানের লেখক হতে চান, তবে আজ থেকেই শুরু করুন আপনার পড়াশোনা। যে বিষয়ের উপর লিখতে চাচ্ছেন, জেনে নিন তার সবকিছু। তখন দেখবেন, লিখতে গেলেই আপনার হাত চলছে দূরন্ত গতিতে। কেননা, তখন আপনার মস্তিষ্ক থাকবে তথ্যে টুইটুম্বুর! লেখালেখি মূলত তথ্যকে সুন্দর করে সাবলীল ভাষায় পাঠকের সামনে উপস্থাপন এবং নিজস্ব অথোরিটি তৈরির প্রচেষ্টা মাত্র!


২। মনটাকে ফ্রেশ করে নেয়া
একটা কথা প্রচলিত আছে যে, মন ঠাণ্ডা তো দুনিয়া ঠাণ্ডা! মন যদি ফ্রেশ না থাকে তবে লিখতে গেলে আপনি পড়বেন অস্বস্থিতে। সেটা কি সুন্দর সুন্দর লেখা তৈরি করার জন্য ভালো হয় বলুন!  মন ফ্রেশ থাকলে, লিখতে গেলে আপনি থাকবেন কুল এবং আপনার লেখা সবচেয়ে সুন্দর আসার সম্ভবনা রয়েছে। তাই, খুজে বের করুন যে কিভাবে আপনার মনটাকে ফ্রেস রাখা যায়। এজন্য লেখা শুরুর পূর্বে ভালো করে একটা গোসল করে নিতে পারেন। তারপর, পেটটাকে একটু ভর্তি করে নিয়ে শুরু করে দিতে পারেন লেখালেখির কাজ। এমনকি, কিছু সময় নিয়ে ধ্যান বা মেডিটেশন করে নিলেও ভালো ফল পাবেন। তবে লেখালেখি শুরুর পূর্বে, সবসময়ই সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপর একটু পড়াশোনা করে নেবার চেষ্টা করবেন।


৩। প্রতিদিন লেখালেখি করা
লেখালেখি শিখতে হলে আপনাকে পড়াশোনা করতে হবে প্রচুর। একটু আগেই একথা বলা হয়েছে। তবে, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, আপনাকে প্রতিদিন ই লেখতে হবে। প্রতিদিনই কমবেশি লিখে যাবেন। ধীরে ধীরে দেখবেন আপনার লেখা আরও বেশি সুন্দর হছে, স্পষ্ট হচ্ছে এবং লেখার বিষয়বস্তু আরও বেশি ফুটে উঠছে।


৪। নতুন নতুন টেকনিক আবিস্কার করা
প্রতিটি লেখকেরই নিজস্ব কিছু মাত্রা আছে। এমাত্রাগুলো ওই লেখকের লেখাকে অন্য লেখকের ওই বিষয়ের উপর কোন লেখাকে আলাদা করে উপস্থাপন করে। একই বিষয়ের উপর আর্টিকেল এর অভাব ইন্টারনেট এ নেই। কিন্তু একই ঘরনার লেখা দ্বিতীয়টি নেই! কেন!

এইরকম কিছু নিজস্ব স্বকীয়তা আপনাকে তৈরি করে নিতে হবে। কিভাবে করবেন? লেখালেখির দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যান এবং লক্ষ্য করুন যে আপনার লেখাগুলির ভালো ভালো দিক কোনগুলি। অর্থাৎ, কি কারনে আপনার কোন লেখা সমাদৃত হবার মতো আর কোন লেখা অনাদৃত হবার যোগ্য। তাহলেই, পেয়ে যাবেন আপনার কাঙ্ক্ষিত উত্তর। 


৫। অন্যরা কিভাবে লিখছে তা জানার চেষ্টা করা
পৃথিবীতে লেখকের অভাব নেই। কিন্তু ভালো লেখকের সত্যিই অভাব রয়েছে। আপনি যদি নিজে একজন ভালো মাপের লেখক হতে চান, তবে আপনাকে ফলো করতে হবে কিছু ভালো মাপের লেখকের লেখা। লক্ষ্য করুন, এখানে ফলো বলতে তার লেখাকে কপি করা, তার স্টাইল অনুসরণ করে লেখা বুজানো হয়নি। বরং, আপনি তার লেখা পর্যবেক্ষণ করবেন যেন তার কমন কমন ব্যাপারগুলো বুজতে পারেন। তিনি কিভাবে তার লেখাগুলিতে নিজস্ব মাত্রা যোগ করছেন, কেন তার লেখাগুলি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, তার লেখার বিভিন্ন দিকগুলো আপনি খুজে বের করবেন। এর ফলে লেখালেখি বিষয়ে শিখতে পারবেন প্রচুর এবং আপনার লেখাও হয়ে উঠবে আরও সুন্দর এবং সাবলীল।



৬। অন্যদের তথ্য উপস্থাপন লক্ষ্য করা
একেকটি লেখাতে মূলত থাকে বিভিন্ন ধরণের তথ্য। পাঠকেরা লেখাগুলি পড়ে মূলত এসব তথ্য জানার জন্য। সুতরাং, আপনি আপনার লেখাকে ঠিক কতোটুকু তথ্যবহুল করতে পেরেছেন তাই আসল কথা। কিন্তু তথ্যবহুল লেখা লিখবেন কি করে যদি না তথ্যবহুল লেখা আপনি না পড়েন এবং লক্ষ্য না করেন! 

৮। আগের লেখাগুলি মাঝে মাঝে বিশ্লেষণ করা
আপনাকে প্রতিদিনই একটু একটু করে লিখতে হবে। তবে, এক দুই সপ্তাহ পর পর আপনার লেখাগুলিকে পর্যবেক্ষণ করবেন। পর্যবেক্ষণ এর মাধ্যমে বের করবেন যে,
  • উক্ত লেখাগুলিতে কি কি ভুল আছে
  • আরও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা যেতো কিনা
  • কেন আপনি আরও সুন্দর করে লিখতে পারেন নি
  • কি কি সমস্যা আছে বলে মনে হয়
যদি এভাবে, কয়েকমাস নিয়মিত চেক করতে পারেন, তবে আপনার লিখা ইনশাল্লাহ খুব সুন্দর হয়ে যাবে। আপনার হাত দিয়ে খুব সুন্দর সুন্দর লেখা বের হবে। 


৯। জ্ঞানই শক্তি
আসলে প্রকৃত শক্তি কোথায় তা জানেন কি? আপনি অবশ্যই জানেন এবং সেটি হল জ্ঞানের ভেতর। অর্থাৎ, জ্ঞানই প্রকৃত শক্তি। একটা মানুষ একটা দেশ চালায়। সেটা গায়ের জোরে নয়! সেটা তবে কিসের শক্তিতে? সেটা অবশ্যই তার জ্ঞানের শক্তি।

আপনি যদি এই জ্ঞানের শক্তি আপনার নিজের মধ্যে আনতে পারেন, তবে আপনার লেখাতে ও দক্ষতা ফুটে উঠতে বাধ্য। সুতরাং, হয়ে যান জ্ঞান পিপাসু আর চর্চা করুন লেখালেখি। 

১০। হেডলাইন
একটা লেখার হেডলাইনটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেন বলুনতো? কারন হল, আপনি যখন অন্য কারো লেখা পড়তে যান, কোন জিনিসটি আগে লক্ষ্য করেন? নিশ্চয়ই, তার লেখার হেডলাইনটিতে আগে একবার চোখ বুলিয়ে নেন, তারপর যদি হেডলাইনটি মনমতো হয়, তবে হয়তো তার লেখাটি পড়তে চাইবেন। এই বিষয়টি শুধু আপনার ক্ষেত্রেই যে সত্য তা নয়। বরং, আপনি, আমি এবং অন্য যারা আছে সবারই এই এক প্রবণতা থাকে। কেননা, পড়াশোনা এবং তথ্যের ভিড়ে আমরা চাই সময়ের সঠিক ব্যাবহার। আর সঠিক ব্যাবহার করতে চাই বলেই, হেডলাইনটা পড়ে ঠিক করে নেই যে পরবর্তী কিছু সময় এই লেখাটা পড়ার জন্য ব্যয় করা যায় কিনা!


হেডলাইন বা শিরোনাম লেখার সময় সর্বদা লক্ষ্য রাখুন নিচের কয়েকটি বিষয়ের উপর...
  • আকর্ষণীয়তা
  • স্পষ্ট
  • নাম্বার
  • কিছু দৃষ্টিনন্দন শব্দের ব্যাবহার
কিভাবে একটি আকর্ষণীয় হেডলাইন লেখা যায়, এ ব্যাপারে আরও লেখা পাবেন ইউনিক লাইব্রেরীর লেখালেখি বিভাগে।

১১। সূচনা
একটি লেখার সূচনা হল হেডলাইন এর পর যে স্থানে একজন পাঠকের চোখ পরে সেটি। সুতরাং, আপনার সূচনাটি হতে হবে আকর্ষণীয়। সাধারণত, পাঠক যদি সূচনা পরে লেখাটি পড়ে শেষ করার আকাঙ্ক্ষাবোধ করে তবে আপনার সূচনা লেখা সার্থক। তাই, সূচনা লিখতে হবে দক্ষভাবে। এজন্য প্রয়োজন সূচনা লেখা শেখার উপর সময় ও শ্রম দেয়া। 

১২। বডি
একটি আর্টিকেল এর বডি অংশে ওই আর্টিকেল এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো থাকে। একজন পাঠক, হেডলাইন বা শিরোনাম পড়ে, তারপর সূচনা শেষ করে বডি অংশে আসে। এই অংশ পড়ে সে যদি সন্তুষ্ট হয়, কিংবা সে যা খুঁজছে তা পেয়ে যায়, তবে সে আপনার লেখার মনে মনে তারিফ করা শুরু করে দিবে। এবং লেখার বাকি অংশ পড়ে, আপনার অন্য কোন লেখা পড়ার অভাববোধ করবেন এবং পেলে পড়তে ও পারেন। এছাড়াও, লেখা শেয়ার এর বিষয়টি তো রয়েছেই। 

১৩। উপসংহার
উপসংহার খুব গুছানো ভাষায় করা উচিত। উপসংহার এ অনেক লেখক আবার পাঠকের মনে "শেষ হইয়াও হইলো না শেষ" ভাব খানি ফুটিয়ে তুলতে পারেন। আসলে, আপনি যদি ভালো মাপের লেখক হতে চান, তবে আপনাকে আপনার উপসংহার লেখার উপর ও সময় দিতে হবে। 

১৪। একটি ছবি হাজার শব্দের কথা বলে
লেখাতে অনেকে ছবি ব্যাবহার করতে চান না। আবার করলেও, উপযুক্ত বা যুতসই কোন ছবি দিতে পারেন না। এটা একটি অদক্ষতার প্রমান। আপনি, আপনার লেখাটির মধ্যে যদি মানানসই ছবি দিতে পারেন, তবে সেটি আপনার লেখাকে নিঃসন্দেহে একটি ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যাবে। প্রয়োজনীয় গ্রাফিক্স সংযোজন একটি ভালো লেখার অন্যতম দিক। 

এই ছবিটি আমাদেরকে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট ইংগিত দেয়।

১৫। কৌশলী হওয়া
লেখার সময় কৌশলী হলে লেখকের সুবিধা হয়, পাঠকের লেখা বুজতে আরাম হয় এবং পরিণামে পাঠক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।  কৌশলী হউয়া যায়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে। যেমনঃ তথ্য উপস্থাপনে, সূচনা লেখার সময়, বডি লেখার সময়। কৌশলী বলতে, আপনার লেখাটা যেন সাদামাটা কোন বিষয় এ হলেও, আপনি এটি আপনার পাঠকের কাছে অনেক আকর্ষণীয় করতে পারেন এই বিষয়টি বুজানো হয়েছে।

১৬। আর্টিকেল কাঠামো
আপনাকে যদি নিয়মিত অনেক লেখা লিখতে হয়, তবে সবচেয়ে ভালো হয়, আপনি যদি ৫-৬ টি আর্টিকেল লেখার কাঠামো তৈরি করে নেন। তারপর, লেখার টপিক অনুযায়ী ওই আর্টিকেল কাঠামোর যেকোনো একটি ফলো করে জাস্ট লেখাগুলি তৈরি করে নিবেন। অর্থাৎ, লিখে নিবেন। এর ফলে, আপনার প্রচুর সময় সাশ্রয় হবে এবং আপনার আগের তৈরি করা আর্টিকেল কাঠামোর মান অনুসারে আপনার লেখার মান থাকবে। ফলে, আপনার লেখা একটা ষ্ট্যাণ্ডার্ড এ থাকবে সবসময়। 

ইন্টারনেট এ যেসব লেখা প্রকাশিত হবে, সেসব লেখার ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই এসইও এর ব্যাপারে লক্ষ্য রাখতে হবে।

লেখালেখি একটি আর্ট। লেখালেখি ব্যাপারটা জন্ম থেকে পাওয়া নয়। এটা অর্জনের বিষয়। আপনি যত বেশি লিখবেন, তত বেশি আপনার হাত লেখালেখিতে পাকবে এবং পরিণামে আপনার লেখা সুন্দর হতে থাকবে। ধীরে ধীরে, আপনার লেখার পাঠকপ্রিয়তাও বাড়তে থাকবে।